Latest

Opinion

মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষকের ভূমিকা ও সমকালীন চ্যালেঞ্জ

মার্জিনা আক্তার রেবা
মার্জিনা আক্তার রেবা

বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং টেকসই অর্থনৈতিক বিকাশের ভিত্তি হলো মানসম্পন্ন শিক্ষা। আর শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্রে থাকেন শিক্ষক। পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান প্রদানই শিক্ষকের একমাত্র দায়িত্ব নয়; বরং শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ এবং দায়িত্ববোধ বিকাশেও শিক্ষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মার্জিনা আক্তার রেবা

শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে, বিশ্লেষণ করতে এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত হয়। আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি শেখার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলেন। একই সঙ্গে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর পরামর্শদাতা, অনুপ্রেরণাদাতা এবং আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবেও কাজ করেন। উন্নত বিশ্বে শিক্ষা খাতকে জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ তারা উপলব্ধি করেছে যে দক্ষ, নৈতিক ও সৃজনশীল মানবসম্পদ তৈরির মূল কারিগর শিক্ষক। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রাকে আরও টেকসই ও ফলপ্রসূ করতে হলে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকল্প নেই, আর সেই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া নয়। একজন শিক্ষক একই সঙ্গে জ্ঞানদাতা, পথপ্রদর্শক, মূল্যবোধের নির্মাতা এবং ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির কারিগর। শ্রেণিকক্ষে তিনি শুধু পাঠদান করেন না; বরং শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করেন এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করার সক্ষমতা তৈরি করেন। বর্তমান বিশ্বে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্র দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, সেখানে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং অভিযোজন ক্ষমতা গড়ে তোলার দায়িত্বও শিক্ষকের ওপর বর্তায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে শিক্ষক জাতি গঠনের এত বড় দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি কি নিজে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও মর্যাদা পাচ্ছেন?

বাস্তবতা বলছে, দেশের অনেক শিক্ষক এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছেন। জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের আয় অপ্রতুল। শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণি ও বিষয় সামলাতে হয়। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব, বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের কাজ তাঁদের মূল শিক্ষাদান কার্যক্রমকে ব্যাহত করে।

অন্যদিকে, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীসংখ্যা এত বেশি যে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার যুগে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষতা ও অবকাঠামোর ঘাটতি। নতুন শিক্ষাক্রম শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং উপযুক্ত পরিবেশ সব জায়গায় সমানভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল ডিভাইস এবং আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর সীমাবদ্ধতা শিক্ষকদের জন্য বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

এ ছাড়া শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত স্বীকৃতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একসময় শিক্ষকতা ছিল সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত পেশাগুলোর একটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন কারণে সেই মর্যাদা কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। একজন শিক্ষক যদি তাঁর পেশার প্রতি গর্ববোধ না করেন এবং সমাজ থেকে প্রাপ্য সম্মান না পান, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তাঁর কর্মপ্রেরণাও প্রভাবিত হতে পারে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আশার কথা হলো, বাংলাদেশের শিক্ষকসমাজ এখনও অসাধারণ নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সীমিত সম্পদ ও নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁরা শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে চলেছেন। এই প্রচেষ্টাকে আরও কার্যকর করতে হলে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং সমাজকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শূন্য পদে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং শিক্ষকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শিক্ষকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাঁদের পেশাগত উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাইলে শিক্ষকদের কেন্দ্র করেই নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ উন্নত ভবিষ্যৎ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সমৃদ্ধ জাতি গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের শুরুটা হয় শ্রেণিকক্ষ থেকে, আর সেই শ্রেণিকক্ষের নেতৃত্বে থাকেন একজন শিক্ষক। তাই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষককে শুধু দায়িত্ব নয়, প্রয়োজনীয় মর্যাদা, সহায়তা এবং আস্থাও দিতে হবে। শিক্ষক শক্তিশালী হলে শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হবে, আর শিক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী হলে দেশ এগিয়ে যাবে আরও দূর।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব বিজনেস, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

২৫৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
Opinion নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন