Latest

Literature

রক্তের স্পন্দন ও কলমের কারুকাজ: নীহাররঞ্জন গুপ্তের সৃজন-ভুবনে এক অন্তহীন পরিক্রমা

গাউসুর রহমান 
গাউসুর রহমান 

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬ ১২:২৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলার ঝিরঝিরে বৃষ্টির কোনো এক অলস দুপুর কিংবা নিঝুম রাতের স্তব্ধতা বাঙালির মজ্জাগত রহস্যপ্রিয়তা যেন এই আবহে আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।

আলমারির কোণে জমিয়ে রাখা সেই পুরনো হলদেটে পাতার বইগুলো থেকে যখন কিরাটী রায়ের পাইপের ধোঁয়া আর সাহেবি সুগন্ধি মিলেমিশে একাকার হয়ে বের হয়ে আসে, তখনই বোঝা যায় কেন একজন মানুষ দশকের পর দশক ধরে বাঙালির ড্রয়িংরুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন। তিনি নীহাররঞ্জন গুপ্ত। হাত যার নাড়ি টিপে শরীরের উত্তাপ মেপেছে, আর কলম যার মনের গহন অন্ধকার অলিগলি খুঁড়ে বের করে এনেছে বিচিত্র সব সত্য। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি এমন এক ধ্রুবতারা, যার আলোয় একদিকে যেমন আছে বিজ্ঞানের তীক্ষ্ণতা, অন্যদিকে আছে কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্যের মায়া।

যশোরের সেই বনেদি পরিবারের আভিজাত্য আর পূর্ব  বাংলার মাটির টান শৈশব থেকেই নীহাররঞ্জনের সত্তায় এক অদ্ভুত মায়াজাল বুনেছিল। কিন্তু জীবন তাকে কেবল কল্পনাপ্রবণ কবি হতে দেয়নি, তাকে দাঁড় করিয়েছিল রক্ত-মাংসের কাটাছেঁড়া আর হাড়-মজ্জার বাস্তবতার সামনে। কলকাতার মেডিক্যাল কলেজের সেই শ্বেতশুভ্র করিডোর আর পরবর্তীতে বিলেতের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা এই পুরো সময়টাই কি কেবল একজন চিকিৎসকের গড়ে ওঠা ছিল? সম্ভবত না। বরং একজন শিল্পী তখন ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিলেন, যিনি মানুষের চামড়ার ওপরের রোগ সারাতে সারাতে অবচেতনভাবেই নজর দিচ্ছিলেন মানুষের অন্তরাত্মার গভীর ক্ষতগুলোর দিকে। 

একজন সার্থক সাহিত্যিক হতে গেলে কেবল ভাষাজ্ঞান থাকলেই চলে না, প্রয়োজন হয় মানুষের চোখের ভাষা পড়ার ক্ষমতা। নীহাররঞ্জন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যার কাছে স্টেথোস্কোপ আর কলম দুটোই ছিল সমাজকে সুস্থ করার মাধ্যম। তাঁর উপন্যাসে যখন কোনো অপরাধী ধরা পড়ে, তখন পাঠক কেবল এক রোমাঞ্চকর সমাপ্তি পায় না, বরং পায় এক রুগ্‌ণ মানসিকতার ব্যবচ্ছেদ। সাহিত্যের এই আঙিনায় তিনি যেন এক অদ্ভুত জাদুকর, যিনি ধ্রুপদী সাহিত্যের গাম্ভীর্যকে বিসর্জন না দিয়েও সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দন ধরতে পেরেছিলেন। 

বাংলার গোয়েন্দা সাহিত্যের ইতিহাসে কিরাটী রায় এক অনন্য সংযোজন। অনেকে হয়তো তাকে আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের আদলে গড়া বলে মনে করেন, কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কিরাটী রক্তে-মাংসেই এক বিশুদ্ধ বাঙালি। তার সেই দীর্ঘাকৃতি দেহ, সিল্কের ড্রেসিং গাউন আর মুখে ধরা দামী পাইপ সব মিলিয়ে এক আভিজাত্যের ছাপ থাকলেও তার বিচারবুদ্ধি আর মানবিকতা একান্তই এদেশীয়। কিরাটী রায় কেবল সূত্র মিলিয়ে অপরাধী ধরেন না, তিনি মূলত এক দার্শনিক। যে সময়ে বাংলা রহস্য সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত ঘটনা বা অলৌকিক দৈবজ্ঞানের ছড়াছড়ি ছিল, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি আনলেন পর্যবেক্ষণ (Observation) আর যুক্তিনির্ভর অবরোহন (Deduction) পদ্ধতি। রেনে দেকার্তের সেই চিরায়ত সত্য  "আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি" কিরাটী চরিত্রের প্রতিটি পদক্ষেপে যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। 

রহস্যের অন্তরালে নীহাররঞ্জন যে খেলাটি খেলতেন, তা কেবল অপরাধ আর শাস্তির খেলা ছিল না। সেটি ছিল মানুষের অবদমিত কামনা আর লুকানো অন্ধকারকে চিনে নেওয়ার প্রক্রিয়া। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের সেই জটিল মারপ্যাঁচগুলো যেন তাঁর গল্পে অতি সহজভাবে ধরা দিত। অপরাধী এখানে কেবল একজন আসামী নয়, সে আমাদেরই সমাজের এক ক্ষতবিক্ষত মানুষ। মানুষের মনের গহীনে জমে থাকা হীনমন্যতা, প্রতিহিংসা কিংবা লালসা কীভাবে তাকে দানবে পরিণত করে, নীহাররঞ্জন তা দেখিয়েছেন অত্যন্ত দরদ দিয়ে। তাঁর কাছে অপরাধ মানেই ঘৃণা নয়, বরং এক ধরণের সামাজিক ব্যাধি। আর একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি সেই ব্যাধির উৎস খুঁজে বের করতেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। 

কিন্তু নীহাররঞ্জন কি কেবল রহস্যেই বন্দি ছিলেন? তাঁর 'উত্তরফাল্গুনী' বা 'মায়ামৃগ' পড়লে মনে হয়, তিনি সমাজের সেই কঠিন সত্যগুলোর কারিগর, যা সচরাচর এড়িয়ে যাওয়া হয়। দেবযানী বা পান্নাবাইয়ের মতো নারী চরিত্রগুলো যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন প্রচলিত সমাজব্যবস্থার নীতি-নৈতিকতা যেন বড় বেশি নড়বড়ে মনে হয়। একজন নারী যখন তার কলঙ্ক তিলকের ঊর্ধ্বে উঠে মাতৃত্বের পরম সত্যকে আলিঙ্গন করে, তখন লেখক যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার চরিত্রে, তার পেশায় নয়। এই যে 'সোশ্যাল রিয়েলিজম' বা সামাজিক বাস্তববাদ, এটিই নীহাররঞ্জনকে জনপ্রিয়তার গণ্ডি পেরিয়ে এক মহৎ জীবনশিল্পীর আসনে বসিয়েছে। 

তাঁর গদ্যের এক অদ্ভুত গুণ হলো এর দৃশ্যমানতা। পড়তে পড়তে মনে হয় যেন চোখের সামনে একখানা রূপোলি পর্দা খুলে যাচ্ছে। চলচ্চিত্রের ভাষায় যাকে বলে 'ভিজুয়ালাইজেশন', নীহাররঞ্জনের প্রতিটি বাক্যে তা স্পন্দিত হয়। কুয়াশায় ঢাকা পুরনো কলকাতার গলি, ভাঙাচোরা জমিদার বাড়ির নোনা ধরা দেওয়াল, আর তার মাঝে হঠাত্‍ বেজে ওঠা কোনো নামহীন পদধ্বনি সবই যেন জীবন্ত। এডগার অ্যালান পোর সেই রহস্যময়তা আর গথিক আবহকে তিনি যেভাবে এদেশীয় মাটিতে বুনেছিলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। 'কালোভ্রমর' পড়তে গিয়ে যে রোমাঞ্চ জাগে, তা কেবল ভয়ের নয়, বরং এক আদিম রহস্যের মুখোমুখি দাঁড়ানোর শিহরণ। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তিনি জানতেন জীবন কতটা নশ্বর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই বিভীষিকা, যখন তিনি সামরিক বাহিনীতে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছিলেন, তখন কাছ থেকে মৃত্যু দেখাটাই হয়তো তাঁর জীবনদর্শনের ভিত গড়ে দিয়েছিল। মানুষের জীবনের এই ঠুনকো অস্তিত্ব আর প্রতিকূলতার মাঝে বেঁচে থাকার লড়াই তাকে অস্তিত্ববাদী দর্শনের কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। জঁ-পল সার্ত্র বা আলবেয়ার কামুর মতো তিনি হয়তো বড় বড় তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেননি, কিন্তু তাঁর রচনার পরতে পরতে সেই একাকিত্ব আর নিয়তিবাদের সুর মিশে ছিল। মানুষ কেন বাঁচে? এত অন্যায়ের মাঝেও কেন ন্যায়কে খুঁজে মরে? এই প্রশ্নগুলোই যেন তাঁর লেখনীর মূল চালিকাশক্তি। 

বাংলার কিশোর সাহিত্যের আকাশেও তাঁর নক্ষত্রসম উপস্থিতি। ছোটদের মনে অজানাকে জানার যে কৌতূহল তিনি তৈরি করে গিয়েছিলেন, তা তাদের কল্পনাশক্তিকে এক অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল। সাধারণ ভাষায় গভীর কথা বলার সেই জাদুমন্ত্র তিনি জানতেন। এক জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, "জীবন হলো এক আশ্চর্য গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটি বাঁকে আমরা নতুন এক নিজেকে আবিষ্কার করি।" সত্যিই তো, তাঁর গল্পের ছলে পাঠক যেন বারবার নিজেকেই নতুন করে চিনেছে। 

সমালোচকরা অনেক সময় তাকে 'জনপ্রিয় ধারার লেখক' বলে একপাশে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, যে সাহিত্য কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন শুনতে পায়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বইয়ের পাতার সঙ্গে বেঁধে রাখে, তাকে কি কেবল 'জনপ্রিয়' তকমা দিয়ে ছোট করা যায়? আন্তোনিও গ্রামশির সেই আধিপত্য বা 'হেজিমনি'র কথা যদি ধরি, তবে দেখা যায় নীহাররঞ্জন একাই সাধারণ মানুষের মনোজগতে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। পাঠকই যেখানে সাহিত্যের শেষ বিচারক, সেখানে নীহাররঞ্জনের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্কের অবকাশ কোথায়? তিনি জানতেন সাধারণ মানুষের আবেগ কোথায় স্পন্দিত হয়, আর সেই সুরেই তিনি তাঁর সুর বেঁধেছিলেন। 

তাঁর লেখার ভাষা ছিল মেদহীন, অনেকটা সার্জিক্যাল স্ক্যালপেলের মতো ধারালো আর নির্ভুল। অহেতুক অলঙ্কারের ভারে তিনি গল্পকে কখনো ভারাক্রান্ত করেননি। জীবনের গতিময়তাকেই তিনি শব্দের রূপ দিয়েছিলেন। মানুষের জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, পাওয়া আর না-পাওয়ার হিসেবগুলো তাঁর কলমে এক অদ্ভুত নির্মোহ রূপ পেত। তিনি যখন হাসপাতালের প্রেক্ষাপটে লিখতেন, তখন চিকিৎসকের পেশাগত লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠত মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার আর্তনাদ। এই যে মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ মমতা, এটাই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। 

নীহাররঞ্জন গুপ্তের সাহিত্যকীর্তি বিশ্লেষণ করলে এক ধরণের উত্তর-ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। এমন এক সময়ে তিনি লিখছিলেন যখন বাঙালি জাতি নিজস্ব সত্তা আর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সন্ধানে ব্যাকুল। কিরাটী রায়ের মতো একটি সুসংহত আর আত্মবিশ্বাসী চরিত্র তৈরি করে তিনি যেন বাঙালির সেই হারানো গর্বকেই ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিরাটী কেবল অপরাধী ধরে না, সে এক জ্ঞানতাত্ত্বিক লড়াই চালায়। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর এই লড়াই আজও সমান প্রাসঙ্গিক। 

শেষ পর্যন্ত নীহাররঞ্জন কী ছিলেন? কেবল একজন চিকিৎসক? নাকি কেবল একজন রহস্য লেখক? সম্ভবত তিনি ছিলেন এক বিরামহীন অন্বেষণকারী। মানুষের শরীরের রহস্য থেকে মনের রহস্য, জীবনের গতি থেকে মৃত্যুর স্তব্ধতা সবখানেই তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। রবীন্দ্রনাথ যেমনটি বলেছিলেন, মানুষ তাঁর অতীতের স্মৃতির মধ্য দিয়ে এক অখণ্ড সত্যকে দেখতে পায়, নীহাররঞ্জনও তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে আমাদের সেই অখণ্ড সত্যের সামনেই দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। 

নীহাররঞ্জন গুপ্তের গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রহস্য বাইরের কোনো বস্তু নয়, সবচাইতে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে মানুষের নিজের ভেতরেই। সেই রহস্যের জট খোলা হয়তো চিরকালই অমীমাংসিত থাকবে, কিন্তু সেই চেষ্টার মধ্যেই তো জীবনের সার্থকতা। 

নীহাররঞ্জন আজ নেই, কিন্তু তাঁর কিরাটী রায় আজও মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় পাইপ টানেন, আজও পান্নাবাইয়ের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিলিয়ে যায়। তাঁর কলম থেমে গেলেও তাঁর সৃষ্টিরা আজও জীবন্ত। তারা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে অন্ধকারের বুক চিরে আলোর রেখা খুঁজে নিতে হয়। এই মহৎ জীবনশিল্পীর কাছে বাংলা সাহিত্য চিরঋণী। তাঁর সৃষ্টি কেবল কালান্তরের কুহক নয়, বরং তা চিরকালীন এক মানবিক দলিল। তিনি ছিলেন আত্মার চিকিৎসক, আর তাঁর আরোগ্যশালা হলো তাঁর কালজয়ী সাহিত্যসম্ভার। সময়ের ধুলো হয়তো অনেক কিছু ঢেকে দেয়, কিন্তু নীহাররঞ্জন গুপ্তের মতো জীবনদ্রষ্টাদের নাম সময়ের সেই ধুলো ঝেড়ে বারবার উজ্জ্বল হয়ে ফিরে আসে ঠিক যেমন পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করে দেয়। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা কেবল শব্দের মালা গেঁথে সম্ভব নয়, বরং তাঁর জীবনদর্শনকে লালন করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত সম্মান।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

২৯৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
Literature নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন