Latest

National

আবাসন খাতে গভীর মন্দা

উচ্চ সুদ ও নির্মাণ ব্যয়ে স্থবির রিয়েল এস্টেট ব্যবসা

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬ ৫:৫০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
দেশের আবাসন খাত বর্তমানে নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়েছেন আবাসন উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে রড, সিমেন্ট, বালি, ইট, পাথরসহ প্রায় ২৬৯টি নির্মাণ উপকরণ সংশ্লিষ্ট ব্যবসাও স্থবির হয়ে পড়েছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় পুঁজি হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা, বাড়ছে ঋণের চাপ।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, ডলারের অস্থিরতা এবং নির্মাণ উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে আবাসন খাতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন প্রকল্প হাতে নিতে পারছে না। চলমান প্রকল্পও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তারা বলছেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রয়োজন বিশেষ নীতি সহায়তা ও স্বল্প সুদে গৃহঋণের সুযোগ।

রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, পুরো আবাসন খাতে মাসিক ফ্ল্যাট বিক্রি একসময় যেখানে প্রায় এক হাজার ইউনিট ছিল, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ ইউনিটে। যেখানে বছরে ৫ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা ছিল, সেখানে অনেক প্রকল্পে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার। বসুন্ধরা, গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডি এলাকায় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জিডিপিতে প্রায় ১৮ শতাংশ অবদান রাখা আবাসন খাত অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাতের সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, রং, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, অ্যালুমিনিয়াম ও স্যানিটারি পণ্যসহ ১৬৯টির বেশি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প জড়িত। ফলে আবাসন খাতের মন্দা সরাসরি এসব শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

রাজধানীর নির্মাণসামগ্রীর বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই বছরে বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাংলামোটর টাইলস মার্কেটের জান্নাত এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মো. জিয়াদ বলেন, আগে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার টাইলস বিক্রি হতো, এখন সেখানে দিনে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো দিন ক্রেতাও পাওয়া যায় না। এতে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, গুদাম ভাড়া ও শ্রমিকের বেতন পরিশোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। পাশাপাশি ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) কমে যাওয়ায় আগে যেখানে ৮ থেকে ৯ তলা ভবন নির্মাণের সুযোগ ছিল, এখন তা ৫ থেকে ৬ তলায় সীমিত হয়ে গেছে। এতে জমির মালিকরাও আবাসন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুর রাজ্জাক বলেন, “এখন পুরো খাতটাই চাপে রয়েছে। বিক্রি নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে। নতুন প্রকল্প গ্রহণ কমে গেছে। শুধু ডেভেলপার নয়, নির্মাণ উপকরণের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার ব্যবসায়ীও সংকটে রয়েছেন।”

বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক বলেন, “চাহিদা কমে যাওয়ায় সিমেন্ট শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বর্তমানে নির্মাণ উপকরণ খাত টিকে থাকার লড়াই করছে।”

অন্যদিকে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল জানান, আবাসন খাতের স্থবিরতার কারণে রডের উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। চাহিদা না থাকায় উৎপাদন দুই-তৃতীয়াংশ কমাতে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন খাত সচল থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, শিল্প উৎপাদন বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পায়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। এ খাতকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর নীতি সহায়তা প্রয়োজন।”

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্মাণ উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আবাসন ও নির্মাণ উপকরণ ব্যবসায়ীদের জন্য কম সুদে ঋণ, কর ছাড় ও সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গৃহঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সুদহার ছিল ১৪ শতাংশ। ব্যাংকাররা বলছেন, উচ্চ সুদের কারণেও সাধারণ মানুষ গৃহঋণ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে আবাসন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুবই সীমিত। সরকারের উদ্যোগে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ চালু করা গেলে আবাসন খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

৩৩৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
National নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন