Latest

Opinion

বিস্মৃতির অন্তরালে এক কালান্তরের নায়কঃ আ জা ম তকীয়ূল্লাহ ও আমাদের আধুনিক বর্ষপঞ্জি

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ৬:৫০ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাঙালি যখন বর্ণিল আয়োজনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে, তখন আমরা মেতে উঠি অসাম্প্রদায়িকতার জয়গানে। কিন্তু এই
উৎসবের যে গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি—অর্থাৎ আধুনিক ও পরিমার্জিত বাংলা বর্ষপঞ্জি—তার নেপথ্য কারিগরদের নাম

আমাদের জাতীয় স্মৃতির পাতা থেকে ক্রমেই মুছে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভাষা সৈনিক, আলোকচিত্রী ও গবেষক আ জ ম তকীয়ূল্লাহর নাম
আজ এক প্রকার অনুচ্চারিতই থেকে যায়। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক দৈন্য ও ‘শূন্যতার সংষ্কৃতি’র এক প্রকট উদাহরণ। আমরা ফল
ভোগ করি কিন্তু বৃক্ষরোপণকারীকে ভুলে যাই। আজম তকীয়ূল্লাহর তৈরি করা সংস্কারই বর্তমান বাংলাদেশের সরকারি ক্যালেন্ডারের
ভিত্তি। তাঁর এই গাণিতিক শুদ্ধিকরণের ফলেই আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা নববর্ষ একটি নির্দিষ্ট তারিখে পালিত হতে
পারছে। তা সত্ত্বেও, নববর্ষের কোনো আলোচনায় বা সেমিনারে তাঁর নাম প্রায় আসেই না। এই যে গুণী মানুষকে আড়ালে রাখার
সংস্কৃতি, এটি প্রমাণ করে যে, আমরা এখনো আমাদের শেকড়কে সম্মান জানাতে শিখিনি।
বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের প্রাথমিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ১৯৬৩ সালে তাঁর
নেতৃত্বে গঠিত কমিটি পহেলা বৈশাখকে ১৪ এপ্রিলে স্থায়ীকরণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সেই প্রস্তাবকে গাণিতিক পূর্ণতা দেওয়া এবং
একটি দীর্ঘমেয়াদী বিজ্ঞানসম্মত কাঠামো দাঁড় করানোর কঠিন দায়িত্বটি পালন করেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র আ জ ম তকীয়ূল্লাহ।
আশির দশকে দীর্ঘ ২০ বছরের নিরলস গবেষণায় তিনি তৈরি করেন ৩৭৯৯ বছরের এক নির্ভুল বঙ্গাব্দ বর্ষপঞ্জি।
তকীয়ূল্লাহর তৈরি করা এই পঞ্জিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্থায়িত্ব। তিনি লিপ-ইয়ার বা অধিবর্ষ গণনার এমন এক
নিখুঁত পদ্ধতি বের করেছিলেন, যার ফলে খ্রিস্টীয় ১ সাল থেকে শুরু করে ৩৭৯৯ সাল পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ সবসময় ইংরেজি ১৪
এপ্রিলেই পড়বে। ঋতুচক্রের সাথে বাংলা মাসের যে বিচ্যুতি ঘটার ঐতিহাসিক ভয় ছিল, তা তিনি গাণিতিকভাবে নিরসন করেন। আজ
বাংলাদেশে আমরা যে ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালন করি, তার গাণিতিক ভিত্তি মূলত তাঁরই শ্রমের ফসল।
আজম তকীয়ূল্লাহ কেবল পঞ্জিকা সংস্কারকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির
সেই উত্তাল মুহূর্তগুলোর দুর্লভ আলোকচিত্র তাঁরই ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিল। ক্যামেরার পাশাপাশি তাঁর কলমও ছিল ক্ষুরধার। তাঁর
রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে---’একুশের সকাল’ যা, ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের এক অনন্য
দলিল। এবং ‘চিনির পুতুল’ তাঁর সংবেদনশীল সাহিত্যবোধের পরিচয় পাওয়া যায় এই সৃষ্টিতে।
এছাড়াও তিনি বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং আজীবন শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন। অথচ এই
ঋদ্ধমানুষটির অবদান নিয়ে নববর্ষের কোনো আলোচনা সভায় কিংবা রাষ্ট্রীয় বড় কোনো আয়োজনে কথা বলা হয় না।
যিনি আমাদের বর্ষপঞ্জিকে আধুনিক বিশ্বের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে তাল মিলিয়ে চলার উপযোগী করে দিলেন,
নববর্ষের উৎসবে তাঁর নাম অনুপস্থিত থাকাটা এক প্রকার ঐতিহাসিক অকৃতজ্ঞতা। এই যে গুণী মানুষকে ভুলে যাওয়ার ‘শূন্যতার
সংস্কৃতি’, তা একটি জাতির শিকড়কে দুর্বল করে দেয়। ইতিহাস কেবল দৃশ্যমান নেতাদের জন্য নয়, ইতিহাস হওয়া উচিত সেই সব
নেপথ্য কারিগরদের জন্যও, যারা নিঃস্বার্থভাবে সংস্কৃতির মেধাভিত্তিক ভিত্তি গড়ে দেন।
আ জ ম তকীয়ূল্লাহর সেই ৩৭৯৯ বছরের বঙ্গাব্দ পঞ্জিকা কেবল একটি গাণিতিক ছক নয়, বরং বাঙালির আধুনিকতার এক
বৈজ্ঞানিক স্মারক। আগামী দিনে নববর্ষের প্রতিটি ভোরে যেন আমরা এই নেপথ্য নায়কের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে
শিখি। তাঁর একুশের সকাল বা চিনির পুতুল, বইগুলোর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম যেন এই কর্মবীরকে চেনার সুযোগ পায়, সেই উদ্যোগ
নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তির ১৬ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
ভাষা আন্দোলনে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
ভবিষ্যতের প্রতিটি বৈশাখ যেন কেবল উৎসবে সীমাবদ্ধ না থাকে; প্রতিটি ভোরের সূর্য যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই
নেপথ্য নায়কের কথা। জাতি হিসেবে, তাঁর প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করার দায়টুকু অন্তত আমরা যেন ভুলে না যাই।

লেখক : কবি, কথাশিল্পী ও নির্মাতা।

৬৪৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
Opinion নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন