Latest

Opinion

আল্লাহ প্রদত্ত ইলম মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি

তৌফিক সুলতান
তৌফিক সুলতান

রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬ ৮:২০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কী—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা নানা দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাই। কেউ বলেন সম্পদ, কেউ বলেন ক্ষমতা, আবার কেউ বলেন অভিজ্ঞতা।

কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ইলম বা জ্ঞান। কারণ জ্ঞানই মানুষকে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে, জ্ঞানই মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয় এবং জ্ঞানই মানুষকে একজন সচেতন, দায়িত্বশীল ও সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

ইসলাম ধর্মে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে মানুষের প্রতি যে প্রথম নির্দেশ দিয়েছেন, তা হলো—পড়ো। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জ্ঞান অর্জন মানুষের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান মানুষের অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করে তাকে আলোর পথে নিয়ে যায়। তাই ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চা সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

মানুষ জন্মগতভাবে সব কিছু জানে না। জন্মের পর পরিবার, সমাজ, শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সে ধীরে ধীরে জ্ঞান অর্জন করে। এই জ্ঞানই তাকে পৃথিবীকে বুঝতে সাহায্য করে এবং জীবনের নানা সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম করে তোলে। একজন জ্ঞানী মানুষ শুধু নিজের জন্য নয়; সমাজের জন্যও উপকারী হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি তার জ্ঞানকে অন্যদের কল্যাণে ব্যবহার করতে পারেন।

ইলম মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে। এটি মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে শেখায় এবং জীবনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি কখনও অন্ধভাবে কিছু গ্রহণ করেন না; বরং তিনি যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যকে গ্রহণ করার চেষ্টা করেন। এই চিন্তাশীল মনোভাব সমাজকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

ইসলামের ইতিহাসে আমরা অসংখ্য জ্ঞানী ব্যক্তির উদাহরণ দেখতে পাই, যারা জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মানবসভ্যতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন, গণিত কিংবা সাহিত্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুসলিম মনীষীরা জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের গবেষণা ও চিন্তার ফলাফল আজও বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করছে।

ইলম কেবল ধর্মীয় জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইতিহাস, সাহিত্য, অর্থনীতি কিংবা সমাজবিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই জ্ঞান মানুষের উন্নয়নের পথ তৈরি করে। একজন মানুষ যত বেশি জ্ঞান অর্জন করবে, তার চিন্তার পরিধিও তত বেশি বিস্তৃত হবে।

আধুনিক যুগে জ্ঞানের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। আজকের পৃথিবী জ্ঞানভিত্তিক সমাজে পরিণত হয়েছে। যে জাতি জ্ঞানচর্চায় এগিয়ে, সেই জাতিই অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে এগিয়ে থাকে। তাই জ্ঞান অর্জন এখন শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়; বরং একটি জাতির অগ্রগতির জন্যও অপরিহার্য।

কিন্তু জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সঠিক জ্ঞান নির্বাচন করা। কারণ আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ অসংখ্য তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছে। এই তথ্যের ভিড়ে কখনও কখনও সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই একজন সচেতন মানুষের উচিত যাচাই-বাছাই করে জ্ঞান অর্জন করা।

ইলম মানুষের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একজন সত্যিকারের জ্ঞানী মানুষ কখনও অহংকারী হন না; বরং তিনি বিনয়ী ও মানবিক হন। কারণ তিনি জানেন যে জ্ঞান যত বাড়ে, মানুষের দায়িত্বও তত বাড়ে। তাই জ্ঞান মানুষকে নম্রতা শেখায় এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে।

শিক্ষা ও জ্ঞান মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একজন শিক্ষিত মানুষ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। তিনি অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারেন এবং একটি উন্নত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের উচিত মানুষকে জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহিত করা।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যতের সমাজ তাদের হাতেই গড়ে উঠবে। যদি তারা সঠিকভাবে জ্ঞান অর্জন করে এবং সেই জ্ঞানকে সৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা এবং চিন্তাশীল আলোচনা—এসবই জ্ঞান অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজন মানুষ যদি নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাহলে তার চিন্তার জগত আরও সমৃদ্ধ হবে। বই মানুষের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে সামনে নিয়ে আসে এবং তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

ইলমের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণ। জ্ঞান তখনই মূল্যবান, যখন তা মানুষের উপকারে আসে এবং সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। তাই একজন জ্ঞানী মানুষের উচিত তার জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা।

আজকের পৃথিবীতে অনেক সময় দেখা যায় মানুষ জ্ঞানকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জ্ঞানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের উপকার করা এবং সমাজকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়া।

আল্লাহ প্রদত্ত ইলম মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি—এই সত্যটি আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিত। কারণ জ্ঞানই মানুষকে সঠিক পথ দেখায়, জ্ঞানই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায় এবং জ্ঞানই মানুষের জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।

তাই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব জ্ঞান অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়া এবং সেই জ্ঞানকে সৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ—সব ক্ষেত্রেই জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ একটি জাতি তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন সেই জাতির মানুষ জ্ঞানকে মূল্য দেয় এবং জ্ঞানচর্চাকে জীবনের অংশ করে তোলে।

সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতি—সবকিছুই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু জ্ঞান মানুষের জীবনে স্থায়ী শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই আমাদের উচিত আল্লাহ প্রদত্ত এই মহান নিয়ামতকে সম্মান করা, জ্ঞান অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা এবং সেই জ্ঞানকে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করা।

 

লেখক : প্রভাষক - ব্রেভ জুবিলেন্ট স্কলার্স অফ মনোহরদী মডেল কলেজ, মনোহরদী, নরসিংদী।
              প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা - ওয়েল্ফশন মানবকল্যাণ সংঘ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।

৩৩০ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
Opinion নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন