Latest

Feature

শিশু শ্রমের নির্মম বাস্তবতা ---

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬ ৭:৫৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
সেদিন কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌর শহরের ব্যস্ততম একটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে এক ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে আলাপ করছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল এক দৃশ্যে—
একটি ডিলার পয়েন্টে কোম্পানির কাভার্ড ভ্যান থেকে মালামাল নামাচ্ছে দুই শিশু।

বড় বড় কার্টনগুলো মাথায়, কাঁধে ও হাতে নিয়ে তারা ট্রাক থেকে নিচে নামছে। ট্রাকের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন প্রাপ্তবয়স্ক কর্মী, আর নিচে ঘাম ঝরাচ্ছে দু’টি শিশু'র শরীর।
দৃশ্যটি নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবারই যেন নতুন করে বুকে বিঁধে যায়। কারণ আমরা জানি—আইন তাদের পাশে, কিন্তু বাস্তবতা নয়।
বাংলাদেশের সংবিধান শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশের নিশ্চয়তা দিয়েছে। প্রচলিত শ্রম আইনে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিকভাবে আমরা শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী। অর্থাৎ কাগজে-কলমে শিশুর অধিকার সুস্পষ্ট—শিক্ষা, নিরাপত্তা, শোষণমুক্ত শৈশব, সুস্থ বিকাশ।
কিন্তু ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি জানে শুধু একটাই কথা—দিন শেষে কিছু টাকা না পেলে বাড়িতে চুলা জ্বলবে না।
একদিন এক দোকানে এমনই এক শিশুর সঙ্গে কথা হয়েছিল। বয়স অল্প, চেহারায় নিষ্পাপ সরলতা। মালিকের কথামতো ক্রেতার হাতে মাল তুলে দিচ্ছিল। জিজ্ঞেস করেছিলাম—স্কুলে যাও না?
বলেছিল—যেতাম। এখন আর যাওয়া হবে না। ছোট বোনকে পড়াবো, তাই আমি বাদ দিলাম।
বাবা অন্যত্র বিয়ে করে চলে গেছে। মা আশেপাশে কাজ করেন। সংসারের ভার নিয়েছে সে।
এই শিশুটি অপরাধী নয়। অপরাধী আমাদের ভঙ্গুর সামাজিক কাঠামো।
অভাব যখন বুক চেপে ধরে, তখন শিশুর হাত থেকে বই সরে যায়।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জাল দুর্বল হলে, সেই ফাঁক দিয়েই শিশুরা পড়ে যায় শ্রমবাজারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বাজারে, গ্যারেজে, হোটেলে, পরিবহনে—শিশুদের কাজ করতে দেখে আর চমকাই না। কয়েকজন মানুষ কষ্ট পান, লেখেন, সভায় বলেন। কিন্তু বৃহত্তর সমাজ থাকে নীরব দর্শক।
শিশুশ্রম কেবল মানবিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি জাতীয় ক্ষতি।
যে বয়সে মেধা গড়ে ওঠার কথা, সে বয়সে শরীর ভেঙে যায়।
যে হাতে কলম থাকার কথা, সে হাতে কার্টন।
এই ক্ষতি ব্যক্তিগত নয়—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ হারায়।
প্রশ্ন হলো—দায় কার?
প্রথম দায় রাষ্ট্রের। আইন প্রয়োগে দৃশ্যমান কঠোরতা প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশু নিয়োগের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি—দরিদ্র পরিবার সহায়তা, একক মায়ের জন্য ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি—বাস্তবে পৌঁছাতে হবে।
দ্বিতীয় দায় স্থানীয় প্রশাসন ও শ্রম তদারকি সংস্থার। ডিলার পয়েন্ট, গুদাম, দোকান—এসব স্থানে শিশু নিয়োগের বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে আনতে হবে।
তৃতীয় দায় ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের। সরবরাহ ব্যবস্থায় শিশুশ্রমমুক্ত নীতি নিশ্চিত না করলে উন্নয়নের দাবি ভণ্ডামিতে পরিণত হয়। সস্তা শ্রমের লোভ নৈতিক অপরাধ।
চতুর্থ দায় সমাজের। শিশুকে “পরিশ্রমী” বলে বাহবা না দিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে—সে স্কুলে নেই কেন? প্রতিবেশীর শিশুর দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়; সমাজেরও।
আমরা উন্নয়নের কথা বলি—সেতু, সড়ক, প্রবৃদ্ধি, পরিসংখ্যান। কিন্তু উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকের মুখে নিরাপত্তার হাসি ফুটে।
কাভার্ড ভ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দুই শিশু আমাদের উন্নয়নের আয়না। আমরা যদি চোখ ফিরিয়ে নিই, আয়নাও একদিন মুখ ফিরিয়ে নেবে।
শিশুর কাঁধ থেকে কার্টন নামিয়ে বই তুলে দেওয়া—এটাই হোক রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। নইলে ইতিহাস একদিন নির্মমভাবে প্রশ্ন করবে— সেদিন তোমরা দেখেছিলে, তবুও কেন চুপ ছিলে?


লেখক: সাংবাদিক।

৪৩৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
Feature নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন