Latest

Country

৩৬ বছরেও হয়নি পার্বত্য ৩ জেলা পরিষদ নির্বাচন, জবাবদিহিহীনতায় বাড়ছে দুর্নীতি

মো. আরিফ, বান্দরবান
মো. আরিফ, বান্দরবান

সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ৭:৩৯ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি- এই তিন পার্বত্য জেলায় জেলা পরিষদের নির্বাচন সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।

এরপর পেরিয়ে গেছে ৩৬ বছর, কিন্তু আর কোনো নির্বাচন হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে সরকার মনোনীত অন্তর্বর্তী পরিষদের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে এসব জেলা পরিষদের কার্যক্রম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় পরিষদে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম বেড়েছে এবং সুষম উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পাহাড়ি অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।

১৯৮৯-এই শেষ নির্বাচন
১৯৮৯ সালে পার্বত্য তিন জেলায় প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেটিই ছিল প্রথম ও শেষ নির্বাচন। এরপর আর ভোট হয়নি। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন সরকার দলীয়ভাবে অন্তর্বর্তী পরিষদ গঠন করে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। প্রতিবছর শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলেও এসব প্রকল্পে অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

চুক্তি থাকলেও অনিশ্চিত নির্বাচন
পার্বত্য তিন জেলার জেলা পরিষদ বিশেষ আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা দেশের অন্য ৬১টি জেলা পরিষদ থেকে আলাদা কাঠামোর। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদি জেলা পরিষদ নির্বাচনের বিধান রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যান ও ৩৩ জন সদস্য আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত হওয়ার কথা।

তবে জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে পৃথক ভোটার তালিকা প্রণয়নের দাবি জানায়। এ দাবি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে পরবর্তী সরকারগুলো নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে অন্তর্বর্তী পরিষদ গঠন করা হয়েছে।

দুর্নীতির তিন খাত
জেলা পরিষদগুলোতে দুর্নীতির অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উঠেছে তিনটি খাতে—

১. নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য:
কর্মচারী নিয়োগে ঘুষ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বদলির ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

২. খাদ্যশস্য বরাদ্দে অনিয়ম:
খাদ্যশস্য প্রকল্পে কাগজে-কলমে বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে তা উপকারভোগীদের হাতে পৌঁছায় না—এমন অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।

৩. ভুয়া উন্নয়ন প্রকল্প:
আংশিক বাস্তবায়িত বা অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের তদন্ত ও মামলা
দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির তদন্তে রাঙামাটি জেলা পরিষদের সাবেক এক সদস্য, দুই প্রকৌশলী ও এক ঠিকাদারসহ মোট নয়জনের বিরুদ্ধে চারটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জিরুনা ত্রিপুরাকে স্থায়ীভাবে অপসারণ করা হয়েছে। বান্দরবানের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লাসহ তিন জেলার আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।

দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালাম জানান, অস্তিত্বহীন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগে চারটি মামলা হয়েছে। তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।

নির্বাচন ছাড়া জবাবদিহি সম্ভব নয়
রাঙামাটি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় পরিষদে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়েছে। জনগণের কাছে জবাবদিহি না থাকায় দুর্নীতির সুযোগ বেড়েছে।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, মনোনীত চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। নির্বাচিত না হলে তাদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমেই জেলা পরিষদে জবাবদিহি ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমান কাঠামোয় তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

তিন পার্বত্য জেলার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তারা বলেন, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কিছু ভুলত্রুটির সুযোগ থাকতে পারে। তবে অনিয়ম রোধে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।

দ্রুত নির্বাচনের দাবি
৩৬ বছর ধরে নির্বাচন না হওয়ায় পার্বত্য তিন জেলায় স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে দ্রুত জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমেই উন্নয়ন ও জবাবদিহির সঠিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা সম্ভব।

২৬২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
Country নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন