Latest

Literature

আষাঢ়ের দাওয়াল রাজা

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ২:৫৯ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
আষাঢ় মাস এলেই বাংলার গ্রাম যেন অন্য এক রূপে সেজে ওঠে। আকাশজুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা, মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের ঝলকানি, আর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ চারদিকে। আর এর মাঝেই মাঠে শুরু হয় কৃষকের জীবনসংগ্রাম।

ওমর মামার গল্পে একদিন উঠে আসে সেই সময়ের কথা—

আমাদের গ্রামের এক প্রভাবশালী ও বিত্তশালী মানুষ ছিলেন জলিল মিয়া। তাঁর অনেক জমিজমা, বিশাল বাড়ি, শান-বাঁধানো পুকুরঘাট, আর ছিল একটি বড় আলসেখানা বা খানকাঘর। ওই খানকাঘরটি শুধু অতিথিদের আশ্রয়স্থলই ছিল না, বরং ছিল গ্রামের মানুষের মিলনমেলা, গল্প-গুজব, তাসখেলা আর নানা সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

ধনী হয়েও জলিল মিয়া ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল ও মিশুক স্বভাবের মানুষ। গ্রামের দরিদ্র কৃষক, মজুর কিংবা পথিক—কারও সঙ্গে বসে গল্প করতে তাঁর কোনো সংকোচ ছিল না। বরং মানুষের সঙ্গে মিশেই তিনি আনন্দ পেতেন।

এক আষাঢ়ের সকালে আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। ঝুম বৃষ্টিতে চারদিক সয়লাব। সেই বৃষ্টির মধ্যেই জলিল মিয়ার আউশ ধানের ক্ষেতে কয়েকজন দাওয়াল কোমরসম পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছিল। বৃষ্টিতে ভিজে তাঁদের শরীর কাঁপছিল, তবুও থামেনি কাজ। কারণ কৃষকের সময় থেমে থাকে না; প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই এগোতে হয় তাঁদের।

এমন সময় একজন দাওয়াল বৃষ্টিতে ভিজে এসে জলিল মিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল—
“চাচা—আর কাজ করতে পারতেছি না। শরীরে ঠান্ডা ঢুকে গেছে। চিড়া ভাজা হলে গা গরম হতো!”

দাওয়ালের কণ্ঠে ছিল ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যে লুকিয়ে ছিল জীবিকার তাগিদ।

জলিল মিয়া আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঘরে খবর পাঠালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেতের কাঠাতে করে গরম-গরম ভাজা চিড়া, সঙ্গে গুড় আর নারকেলের কুচি সাজিয়ে পাঠানো হলো খানকাঘরে। সেখান থেকে নৌকায় করে সেই খাবার পৌঁছে দেওয়া হলো মাঠের দাওয়ালদের কাছে।

বৃষ্টিভেজা অবস্থায় মাঠে দাঁড়িয়ে দাওয়ালরা যখন সেই গরম চিড়া খেতে লাগল, তখন তাঁদের মুখে ফুটে উঠল পরম তৃপ্তির হাসি। যেন সামান্য সেই খাবারেই ফিরে এলো নতুন শক্তি, নতুন উদ্যম।

খাবার পৌঁছে দিয়ে আলসেখানায় ফিরে এসে জলিল মিয়া মুচকি হেসে আক্ষেপের সুরে বললেন—
“আষাঢ় মাসে দাওয়াল হলো রাজা,
তিনবেলা গরম ভাত,
মাঝে চিড়ে ভাজা।”

তাঁর এই কথায় উপস্থিত সবাই হেসে উঠলেও কথার ভেতরের সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারেনি। কারণ সেই সময় আষাঢ় মাসে দাওয়ালদের কাজ করাতে হলে দিনে তিনবার ভাতের ব্যবস্থা করতে হতো। মাঝে মাঝে শক্তি ফেরাতে দিতে হতো চিড়া, মুড়ি, গম বা তিল ভাজা।

এই ছিল বাংলার গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক অলিখিত নিয়ম। শ্রমিকের শ্রমের মূল্য শুধু মজুরিতেই নয়, তাঁর যত্ন আর সম্মানেও প্রকাশ পেত।

গ্রামবাংলার লোককথা আর প্রবাদে বারবার ফিরে আসে এই সত্য—মাঠে যারা ঘাম ঝরায়, ফসলের প্রকৃত কারিগর তারাই। জমির মালিক হয়তো ফসলের মালিক হয়, কিন্তু সেই ফসলের প্রাণ জড়িয়ে থাকে দাওয়ালদের ঘামে, কষ্টে আর সংগ্রামে।

আজ সময় বদলেছে, কৃষির ধরন বদলেছে, যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু আষাঢ়ের ঝুম বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটার সেই শ্রমগাথা এখনো লোকমুখে গল্প হয়ে বেঁচে আছে।

এই গল্প শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—বরং এটি বাংলার মাটি, মানুষের শ্রম আর সম্মানের এক চিরন্তন লোকজ দলিল।

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে গল্প)

লেখক: সাংবাদিক।

৬০১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
Literature নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন